১৬, অক্টোবর, ২০১৮, মঙ্গলবার

ফের কেন শিকড় গজাচ্ছে বৃক্ষমানব আবুল বাজনদারের শরীরে

আপডেট: মে ২৯, ২০১৮

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন
ফের কেন শিকড় গজাচ্ছে বৃক্ষমানব আবুল বাজনদারের শরীরে

খুলনার পাইকগাছা উপজেলায় বিরল ইপিডারমোসিপন্টাসিয়া ভেরুসিফরমিস রোগে আক্রান্ত রাতারাতি বিশ্বমিডিয়ায় বৃক্ষমানব হিসেবে পরিচিতি পাওয়া ভ্যানচালক আবুল বাজনদার ভালো নেই। গত বছর ১৬ দফার সফল অস্ত্রোপচারে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরা আবুলের হাত-পায়ে ফের গজাতে শুরু করেছে গাছের শিকড়-বাকড়ের মতো শ্বাসমূল বস্তু।

আর এতে নতুন জীবনে ডাক্তারদের পুনর্বাসনে মাথা গোঁজার ঠাঁই পাওয়া আবুলের মনে নতুন করে আশঙ্কা দানা বেঁধেছে। বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদেরও। সেবার ১৬ বারের সফল অস্ত্রোপচারে পাঁচ কেজি ওজন কমেছিল আবুলের। দুঃসহ স্মৃতিকে মনে করে বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন আবুলের আশঙ্কা, হয়তোবা বিরল এ ব্যাধি আমৃত্যু পিছু ছাড়বে না তার।

পাইকগাছা পৌরসভার সরল গ্রামের মানিক বাজনদারের চার ছেলে ও চার মেয়ের মধ্যে আবুল ষষ্ঠ। পারিবারিক সূত্র জানায়, ১০ বছর বয়স থেকে সে বিরল রোগ হিউম্যান পাপ্পিলোমা ভাইরাসে (এইচপিভি) আক্রান্ত হলে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে গাছের শিকড়ের মতো লম্বা অংশ গজাতে থাকে। এক সময় চলাচল পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায় তার।

স্থানীয়পর্যায়ে নানা রকম চিকিৎসা করিয়ে সহায়-সম্বল ও সর্বশেষ বসতভিটা বিক্রি করে নিঃস্ব হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে স্বজনরা তাকে ভ্যানে করে বাজারে বাজারে ভিক্ষা করে সংসারের খরচ ও স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা করাচ্ছিলেন।

এমন পরিস্থিতিতে দেশের প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় তাকে নিয়ে ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশের পর সরকারি তত্ত্বাবধানে ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর থেকে তাকে ভর্তি করা হয় ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটে। এখনো তিনি সেখানেই চিকিৎসাধীন। জরুরি প্রয়োজনে মাঝে মধ্যে বাড়িতে আসেন।

চিকিৎসকেরা জানান, বিশ্বে ওয়ার্ট রোগে আক্রান্তের সংখ্যা এখনো পর্যন্ত চারজন। এমন বিরল রোগ সাধারণত জিনগত কারণে হয়ে থাকে বলেই মনে করেন তারা। পাপ্পিলোমা ভাইরাস মানুষের শরীরে ১০০ উপায়ে আক্রমণ করতে পারে। এর মধ্যে ৩০ শতাংশই যৌনাঙ্গে আক্রমণ করে থাকে। সব ধরনের এইচপিভি ভাইরাসের কারণে শরীরে আঁচিল হতে পারে।

এর আগে ডিএমসিএইচর বার্ন ইউনিটের প্রধান সমন্বয়ক ডা: সামন্তলাল সেন বলেন, এ ধরনের অসুখ বাংলাদেশে এই প্রথম এবং গোটা বিশ্বে বিরল। ২০০৭ ও ২০০৯ সালে মাত্র দু’জন এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার রেকর্ড রয়েছে। এদের একজন ইন্দোনেশিয়ায় ও অপরজন রোমানিয়ায়। এ ধরনের রোগীকে সাধারণত ‘বৃক্ষমানব’ বলা হয়ে থাকে।

২০১৫ সালে যে সময় আবুলকে ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়, তার সপ্তাহখানেক আগে ইন্দোনেশিয়ায় বিরল এ রোগে আক্রান্ত কসওয়ারা দেদে নামে একজনের মৃত্যু হয়। ঠিক এমন পরিস্থিতিতে ঢাকা মেডিক্যালের (ডিএমসিএইচ) বার্ন ইউনিটের চিকিৎসকেরা বাজানদারের চিকিৎসায় বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিক্যাল বোর্ডের সফল অস্ত্রোপচারে আবুলের সুস্থতা গোটা চিকিৎসা জগতের বিরল সাফল্য এনে দিয়েছিল।

এদিকে আবুল বাজনদার তার প্রতিক্রিয়ায় জানান, অসুস্থ অবস্থায় অসহ্য যন্ত্রণা হতো আক্রান্ত স্থানে। কখনো ভাবিনি নতুন জীবনে আর ফেরা হবে। তবে জীবনের খারাপ দিনগুলোয় দেশবাসীর পাশাপাশি স্ত্রীকে পাশে পেয়েছিলেন তিনি। স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় উঠে আসে বিষয়টি। ফের মাথাচাড়া দিচ্ছে সেই রোগ।

দুঃসহ যন্ত্রণা কী তবে ফের থাবা বসাবে তার জীবনে? নতুন করে হাত-পায়ের আঙুলগুলো কি ঢেকে যাবে অদ্ভুত শিকড়ে? এমন আশঙ্কায় বারবার তাড়া করে ফিরছে বৃক্ষমানব আবুল ও তার পরিবারকে।

আবুল বাজনদারের চিকিৎসক টিমের অন্যতম সদস্য অধ্যাপক ডা: কবির চৌধুরী জানতে পারেন, আবুলের বসবাসের কোনো জায়গা নেই। এরপর তিনি জমি কিনে বাড়ি করার জন্য আবুলকে সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসেন। চিকিৎসকের আর্থিক সহায়তায় আবুল ২০১৬ সালের জুনে পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ডের সরল মৌজায় শিক্ষক মাখনলাল গংদের কাছ থেকে প্রায় ১১ শতক জমি কিনে বাড়ি নির্মাণ করে সেখানে তিন মাস ধরে বসবাস করছে তার পরিবার।

তবে বাড়িতে যাতায়াতের কোনো পথ না থাকায় পরিবার-পরিজনের অবরুদ্ধ হয়ে পড়ার খবরে দুই দিনের জন্য বাড়ি এসেছিলেন আবুল। ওই সময় তিনি জানান, প্রতিবেশী নজরুল ইসলাম তার যাতায়াতের পথে একটি খুপড়িঘর তোলায় তাদের যাতায়াতের পথটি রুদ্ধ হয়। পরে বিষয়টি পাইকগাছা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আমিনুল ইসলাম বিপ্লবকে অবহিত করলে তার হস্তক্ষেপে দখলমুক্ত হয় রাস্তাটি।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন