ভয়ংকর প্রতারণার শিকার না হতে চাইলে ফেসবুকের এসব ম্যাসেজ থেকে সাবধান

বড় ভাই, আমার খুব বিপদ। আমার ৪ হাজার টাকা লাগবে, এক্ষুনি। পাঠাতে পারবেন? আমার মুঠোফোনেও ব্যালেন্স নেই। তাই আপনাকে ফোন করতে পারছি না।’ ফেসবুকের মেসেঞ্জার ইনবক্সে হঠাৎ লিটন অভির এমন ‘জরুরি’ বার্তা চোখে পড়ে তার এক ধনাঢ্য খালাতো ভাইয়ের। শান্ত শিষ্ট ও ভদ্র সেই ছোট ভাইয়ের বার্তা পেয়ে বড় ভাই ভাবেন, নিশ্চয়ই বিশেষ প্রয়োজনে টাকা দরকার পড়েছে লিটনের।

আশপাশে হয়তো কোনো ব্যাংকের বুথও নেই। সাত-পাঁচ না ভেবেই তার পাঠানো বিকাশ নম্বরে টাকা পাঠিয়ে দেন। বিকেল বেলা লিটন অভিকে ফোন করে তার সেই বড় ভাই। জিজ্ঞাসা করে তার বিপদ কেটেছে কিনা। তখন অভি বলে সে বিপদে পরবে কেন। সে তো সারাদিন ঢাকায় ব্যস্ত ছিল একটি চাকুরীর ইন্টারভিড দিতে।

পরে উভয়েই বুঝতে পারে ভয়ংকর প্রতারণার শিকার হয়েছেন তারা। একপর্যায়ে অনেক কষ্টে তার হ্যাক হয়ে যাওয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্টটি রক্ষা করেন। পরে পোস্টে অন্য বন্ধুদের সঙ্গে বিষয়টি শেয়ার করেন। জানতে পারেন, ইতোমধ্যে তার নামে ৮/১০ জনের কাছ থেকে হাজার হাজার টাকা চাওয়া হয়েছে।

শুধু লিটন অভি নয়, ফেসবুক-বিকাশের মাধ্যমে এভাবে প্রতিদিন নিত্যনতুন প্রতারণার জালে পা দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ। না বুঝে প্রতারকদের টোপে নিঃস্ব হচ্ছেন বিকাশ গ্রাহক কিংবা সাধারণ ফেসবুক ব্যবহারকারীরা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ফেসবুক হ্যাক করার পর আইডির প্রকৃত মালিকের কাছেও টাকা দাবি করছে ডিজিটাল অপরাধীরা। টাকা দিলে ফেরত দেওয়া হয় আইডি।

প্রতিদিনই এ রকম অভিযোগ আসছে সাইবার ক্রাইম ইউনিটের কাছে। তবে যে হারে মানুষ প্রতারণার শিকার হচ্ছেন, সে হারে মামলা হচ্ছে না। অর্থাৎ মানুষ ঝামেলা এড়াতে পুলিশের কাছে যান না। তাই ডিজিটাল এই প্রতারণার জাল কতদূর গড়িয়েছে সে বিষয়ে অনেকটাই অন্ধকারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে ডিজিটাল এসব ফাঁদ প্রতিরোধ করতে না পারলে ভবিষ্যতে আরো ভয়ংকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হবে।

রাজধানী ঢাকার পাশ্ববর্তী জেলা মানিকগঞ্জেও ঘটে চলেছে একের পর প্রতারণার ঘটনা। ফেসবুকে বন্ধু পাতিয়ে চলেছে প্রতারণার। কখনও শারীরিক সম্পর্কের টোপ দেওয়া হচ্ছে, কখনও আবার নিখুঁত প্রেমের গল্প বানিয়ে চলছে দেদার প্রতারণার। সাধু বাবা-জিনের বাদশা সেজে কিংবা বিকাশ অফিসের কর্মকর্তা সেজে এমন ডিজিটাল সাইবার প্রতারণা চক্রের খপ্পড়ে পড়ে হাজার হাজার টাকা খুইয়েছেন অনেকে।

গাড়ী-বাড়ির লোভ দেখিয়েও সর্বশান্ত করছে গ্রামের সহজ সরল মানুষদের। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাটুরিয়া বাজারের এক ব্যবসায়ী কাছে মোবাইল কোম্পানীর কর্মকর্তা সেজে কল দিয়ে তাকে দামী প্রাইভেটকার দেওয়ার ঘোষনা দিয়ে ৭/৮ লাখ টাকা

হাতিয়ে নওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আবার প্রযুক্তির এই প্রতারণার ফলে অনেকেরই সংসারে ভাঙ্গন লেগেছে।

মানিকগঞ্জের আব্দুস সাত্তার নামের এক ব্যাক্তির ফেসবুক আইডি হ্যাক করে ওই আইডি থেকে কমপক্ষে ৫০ জন ফ্রেন্ডদের কাছ থেকে এই নাম্বারে ০১৮২৩৮০৩০১৫ বিকাশে টাকা চেয়েছে হ্যাকাররা। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নতুন নতুন কৌশলে অন্যের ফেসবুক আইডি হ্যাক করে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এক শ্রেণির হ্যাকার চক্র। যে কারণে ফেসবুক এখন চরম নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে।

ভুক্তভ’গী আব্দুস সাত্তার জানান, আমার ফেসবুক-ম্যাসেন্জার হ্যাক করে আমার বন্ধুদের কাছে কে বা কারা টাকার জন্য ম্যাসেজ দিচ্ছে। আমি কিছুই জানি না। আমার এক বন্ধু প্রথমে ফোন করে আমার কাছে কুশালাদি জানার পর আমাকে বলে দোস্ত তুমি কি কোন ম্যাসেজ দিছো। আমি বলি কেন কিসের ম্যাসেজ। তখন বলে ঘটনা টি। এমন কি বিকাশ নাম্বারও দিছে, নাম্বারটা ০১৮২৩৮০৩০১৫।
শনিবার সকাল ১০টার দিকে ওই

সবুক আইডি থেকে অনেককে ম্যাসেজ পাঠিয়ে ইমারজেন্সি সমস্যা দেখিয়ে কারও কাছ থেকে ৫০০ আবার কারও কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাওয়া হয়েছে। একই সময় শামসুন নাহার রুবি নামক এক কলেজ ছাত্রীর ফেসবুক আইডি থেকে তার ফেসবুক ফ্রেন্ড এবং রুমমেটের কাছ থেকেও টাকা চাওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সরকারী কর্মকর্তা ও ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের মোবাইল নম্বর ক্লোন করে টাকা চাওয়ার ঘটনাও বৃদ্ধি পেয়েছে।

প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র মারফত জানা গেছে, প্রথমে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা হয়। তারপর তার ফ্রেন্ডলিস্টে থাকা কাছের মানুষজনের কাছে প্রতারণার মাধ্যমে টাকা আত্নসাত করে। এছাড়াও স্বয়ং হ্যাকার যোগাযোগ করে অ্যাকাউন্টের মালিকের সাথে এবং অ্যাকাউন্ট ফিরিয়ে দেয়ার পরিবর্তে চাওয়া হয় টাকা!

গত কিছু দিন যাবত এভাবে অনেক ফেসবুক ব্যাবহারকারীর অ্যাকাউন্ট হ্যাক করার খবর পাওয়া গেছে। ঈদের আগে প্রায় সব শ্রেণী পেশার মানুষের কাছেই কম বেশি টাকা থাকে। তাই ঈদকে সামনে রেখে এই সাইবার প্রতারণা বৃদ্ধি পেয়েছে।

অ্যাকাউন্টের মালিকের সাথে ফোনের মাধ্যমে অথবা অ্যাকাউন্টের ওয়ালে হ্যাকার নিজের ফোন নম্বর লিখে দিচ্ছে। আর ফোন দিলেই ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা চাওয়া হচ্ছে। টাকা না পেলে অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দেয়া হচ্ছে, যারা টাকা দেয়নি তাদের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে।

এমন একজন ভুক্তভোগী মোঃ রফিক শনিবার জানান, তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টটি হ্যাক করা হয়। ০১৯১০৩৪০৪১২ নম্বর থেকে ফোন আসে। ফোন থেকে অপরিচিত কণ্ঠ ৫ হাজার টাকা দাবি করে। অ্যাকাউন্ট উদ্ধারের অনেক চেষ্টা করেও কোনও লাভ হয়নি। শেষ পর্যন্ত কথিত হ্যাকার ১ হাজার টাকার বিনিময়ে অ্যাকাউন্টটি ফেরত দিতে রাজি হয়। পরে তার দেয়া বিকাশ নম্বরে টাকা পাঠানোর পর ফিরিয়ে দেয়া হয় অ্যাকাউন্টটি।

এ বিষয়ে সাইবার অপরাধ প্রতিরোধ এবং দমনে চালু হেল্পলাইনে (০১৭৬৬৬৭৮৮৮৮) যোগাযোগ করলে তারা জানান, তারা এ বিষয়টি দেখেন না। একই নামে একাধিক ফেসবুক বা সামাজিক সাইটের অ্যাড্রেস দিয়ে কাউকে হয়রানির ক্ষেত্রে তারা ফেক আইডি বন্ধের ব্যবস্থা নিয়ে থাকে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সম্প্রতি এমনি হ্যাকিংয়ের কবলে পড়েন এক প্রবাসীর স্ত্রী। ফেসবুক হ্যাকাররা এই ফেসবুক আইডিটি প্রথমে হ্যাক করে। পরে তার ফেসবুক ফ্রেন্ড লিস্টে থাকা মাহফুজ আহমেদ ও আব্দুল করিম নামের ব্যক্তিদ্বয়ের কাছে খুব জরুরি প্রয়োজনে ২ হাজার টাকা চান। এবং এই ২ হাজার টাকা ঋণ হিসেবে নিবেন যা আগামী মাসে ফেরত দেওয়ারও প্রতিশ্রুতি দেন। হ্যাকারদের কথায় সারা দিয়ে একটি বিকাশ নাম্বারে ২ হাজার বিকাশ করেন একজন।

অন্যজনের সন্দেহ হলে তিনি খোঁজ খবর নিয়ে দেখেন ওই নারী কারও কাছে কোন টাকা চান নি। দার ফেসবুক আইডি হ্যাক হয়েছে। একইভাবে ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীর আইডি হ্যাক করে তার স্বজনদের কাছ থেকে টাকা দাবি করা হচ্ছিল। থানায় জিডি করার বিষয়টি জানাজানি হলে তার আইডিটি ফেরত পান তিনি।

আই.টি এক্সপার্ট, গ্রাফিক্স ডিজাইনার এন্ড ট্রেইনার তমাল তরু চৌধুরী জানান, আপনার যত কাছের লোকই হোক না কেন সে যদি ফেসবুক থেকে মেসেজের মাধ্যমে টাকা চায়, প্রথমে ফোন দিয়ে কনর্ফাম হোন তার পরে টাকা পাঠায়েন। কিছুদিন আগে আমার কাছে আমার এক সিনিয়র ভাই এর ফেসবুক থেকে আমার কাছে টাকা চায় এবং আমি যখন ওই বড় ভাইকে ফোন দেই তখন বুঝতে পারি তার ফেসবুক হ্যাক হয়ে গেছে।

-দি বাংলাদেশ টুডে