হজরত ফাতিমা (রাঃ) এর ইন্তেকালের পর তাঁর লাশের খাটিয়া বহন করার মানুষ মাত্র তিনজন

হজরত ফাতিমা (রাঃ) এর ইন্তেকালের পর তাঁর লাশের খাটিয়া বহন করার মানুষ মাত্র তিনজন।
হজরত আলী (রাঃ) এবং শিশু হাসান ও হোসাইন (রাঃ) হজরত আলী ভাবছিলেন যে, খাটিয়া বহন করার জন্য মানুষ আরও একজন প্রয়োজন তবেই চার কোনায় চারজন কাঁধে নিতে পারবেন।

এমন সময় হজরত আবু জর গিফারী (রাঃ) এলেন ও খাটিয়ার এক কোনা বহন করলেন। হজরত আলী প্রশ্ন করলেন, আমি তো কাউকে জানাইনি, আপনি জানলেন কিভাবে ?

হজরত আবু জর গিফারী (রাঃ) বলেন, আমি আল্লাহর রসুল (সঃ) কে স্বপ্নে দেখেছি। তিনি বললেন, হে আবু জর! আমার ফাতিমার লাশ বহন করার লোকের অভাব, তুমি গিয়ে একটু ধর।হজরত আবু জর গিফারী (রাঃ) কবরের কাছে গিয়ে বললেন, হে কবর, আজ তোমার মধ্যে কে আসছে জান ?

দো জাহানের বাদশাহের মেয়ে, হজরত আলীর স্ত্রী, হাসান ও হোসাইনের মা, জান্নাতের সর্দারনী, খবর্দার কবর বেয়াদবি করোনা।

আল্লাহ্ কবরের জবান খুলে দিলেন, কবর বলল, আমি দো জাহানের বাদশাহের মেয়েকে চিনিনা, হজরত আলীর স্ত্রীকে চিনিনা, হাসান ও হোসাইনের মাকে চিনিনা, জান্নাতের সর্দারনীকে চিনিনা, আমি শুধু চিনি- ঈমান আর আমল।

একটু চিন্তা করে দেখুন- যদি নবী (সঃ) এর আদরের মেয়ে যাকে জান্নাতের সর্দারনী বলা হয়েছে। তার জন্য যদি কবর এমন হয়! তাহলে আমরা কিসের আশায় কি চিন্তা করে আল্লাহর হুকুম থেকে এতো গাফেল (ভুলে) আছি।
আল্লাহ্ আমাদের ঈমান ও নেক আমল নিয়ে কবরে যাবার তওফীক দান করুন। . . . (আমিন)

রাসূল (সা.) এর ঐতিহাসিক মক্কা বিজয়

মক্কা বিজয়। ইসলামের ইতিহাসের মহা বিজয়গুলোর একটি। যে বিজয়ের ধারা দিয়ে ইসলাম পৃথিবীর বুকে শক্তি সাহস ও বীরত্ব নিয়ে বুকটান করে বেঁচে আছে। ইসলামের জয়যাত্রার পিছনে এই মক্কা বিজয়ের অনুপ্রেরণা সদাই প্রাণবন্ত ও জাগরুক।

মক্কা বিজয় ইসলামকে আগে বাড়ার মূল ভিত্তি হয়ে আজও দেদীপ্যমান। ইতিহাসের বর্ণনায় পাওয়া যায়, মক্কাবিজয় পৃথিবীর সবচে’ সফল একটি বিজয়। মহাবিজয়; অথচ তাতে হয়নি কোনো রক্তপাত, হত্যা, মারামারি ও অস্ত্রের ঝঁনঝনানি। প্রাণে প্রাণে হয়নি হতাহতের ঘটনা। ঘটেনি প্রাণনাশের পৈচাশিক কোনো কাহিনী। অসহায়ের মরণ চিৎকারে কাঁপেনি ধরণী। রক্তবানে কোনো বন্যা হয়নি।

মক্কাবিজয়ের যাত্রার যেভাবে শুরু: ৬ষ্ঠ হিজরির কথা। হজরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন মদীনায় বসবাস করেন। একদিন তিনি মক্কা জিয়ারতের কথা সাহাবিদের কাছে ব্যক্ত করলেন। একথা শুনে সাহাবিরা আনন্দে আত্মহারা।

কারণ মক্কা ছিল তাদের জন্মস্হান। যে ভূমির মায়া তাদের কাছে জীবনের চেয়ে বেশি। ইসলামের জন্য মক্কা ছেড়েছেন। সেই মক্কায় আবার আগমনের কথা শুনে সবাই খুশিতে টগবগ। কতদিনের চেনা জানা অলিগলি দেখা হয়না! যে মাটির সঙ্গে তার রক্তের সম্পর্ক, যে মাটিতে কেটেছে তাদের শৈশব কৈশোরের উত্তাল দিনগুলো।

সাহাবিগণ আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। একদিন দিনক্ষণ ঠিক করে মদীনার আনসারদেরও সঙ্গে নিয়ে ওমরা পালনের উদ্দেশ্যে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার দিকে রওনা দিলেন। এই কাফেলায় লোকের সংখ্যা ছিল প্রায় চৌদ্দশ।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগেই বুঝতে পেরেছিলেন, মক্কার কুরাইশরা সহজে তাদেরকে মক্কায় প্রবেশ করতে দিবে না। তাই তিনি যুলহুলাইফা নামক স্হানে যাত্রা বিরত করে পশু কোরবানি সম্পন্ন করেন। এদিকে লোক মারফত হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতে পারলেন যে, মক্কার কুরাইশরা রাসূল (সা.) আগমনের খবর শুনে যুদ্ধের প্রতি সংকল্পবদ্ধ হয়েছে, যে করেই হোক মুহম্মদ (সা.) ও তার বাহিনীকে মক্কায় প্রবেশ করতে দিবে না।

এই খবর শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দূত হিসেবে হজরত ওসমান (রা.)-কে মক্কায় প্রেরণ করলেন। তিনি তাদের কাছে রাসূল (সা.) এর মক্কায় আগমনের উদ্দেশ্য যে যুদ্ধ নয়, শুধু ওমরা একথা বুঝালেন। তারা তা মানলেন না। সন্ধির প্রস্তাব পেশ করা হলো। সন্ধির সকল শর্ত ছিল কুরাইশদের সুবিধামতে।

তারপরও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা মেনে নিলেন। অনেক সাহাবী তা মানতে ছিলেন না। বিশেষ করে হজরত ওমর ফারুক (রা.) কোন অবস্হাতেই মানতে চাননি। অনেক বুঝানোর পর তিনি শান্ত হলেন। এই পরাজয়সূচক সন্ধিকে মহান আল্লাহ তায়ালা প্রকাশ্য বিজয় বলে পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন। তখন সাহাবীদের অনেকে প্রকাশ্য বিজয় বুঝে আসেনি।

মদীনা আর মক্কার মাঝে যখন সন্ধি হয়ে গেল, তখন দাওয়াতের কার্যক্রম ব্যাপক হলো। সন্ধি মুতাবেক আরবের খুজয়া গোত্র রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে মিত্র গড়লো। ওদিকে কুরাইশদের সঙ্গে বনু বকর গোত্র মিত্র গড়লো। বনু খুজয়া আর বনু বকরের মাঝে ছিল পুরানো দ্বন্দ্ব।

বহুদিন যাবত তাদের মধ্যে যুদ্ধ বিগ্রহ ছিল চলমান। সন্ধির ফলে কিছু দিনের জন্য সেই অন্যায় যুদ্ধ হাঙ্গামা বন্ধ ছিল। কিন্তু বনু বকর সন্ধির সময়কে মহাসুযোগ মনে করে রাতের আঁধারে বনু খুজয়ার ওপর হামলা করলো।

এই হামলার ক্ষেত্রে কুরাইশরা পর্যাপ্ত পরিমাণ সাহায্য করলো। ইকরিমা ইবনে আবি জাহাল সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া, সুহাইল ইবনে আমর মুখোশ পড়ে বনু বকরের পক্ষে যুদ্ধ করলো। বনু খুজয়া অনন্যোপায় হয়ে হেরেমে আশ্রয় নিলো কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। হেরেমের ভিতরই বনু খুজয়ার লোকদের হত্যা করলো।

বনু খুজয়া রাসূলুল্লাহর (সা.) এর কাছে সংবাদ পাঠালেন এবং সাহায্য চাইলো। রাসূলুল্লাহ ঘটনার বিবরণ শুনে কুরাইশদের নিকট তিনটি শর্ত পাঠালেন এবং বললেন এই তিনশর্তের যেকোনো একটি মেনে নাও। শর্ত তিনটি হলো, (১) এই অন্যায়ের হামলায় যারা মারা গেছে তাদের রক্তপণ দিতে হবে (২) কুরাইশরা বনু বকরের সাহায্য করা থেকে বিরত থাকবে (৩) ঘোষণা করে দেয়া হোক যে হুদাইবিয়ার সন্ধিচুক্ত ভঙ্গ করা হলো।

কুরাইশদের পক্ষে কুরতাহ ইবনে ওমর ঘোষণা করলো, তৃতীয় শর্তটি মেনে নিলাম। তাদের এই সিদ্ধান্তের ফলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয়ের অভিযানের কথা চিন্তা করেন। সেই লক্ষ্যে ৮ হিজরির ১০ই রমজান হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রায় দশহাজার সৈন্যসহ মক্কার দিকে রওয়ানা হন। পথিমধ্যে আরবের অন্যান্য গোত্রও যোগ দিতে থাকে। বিশাল বাহিনীতে পরিণত হয় রাসূলুল্লাহ এই মক্কাভিযানের কাফেলা।

কাফেলা মাররুজ যাহরান নামক স্হানে শিবির স্হাপন করে। যা ছিল মক্কা থেকে এক মঞ্জিল বা তার থেকেও কাছে। যেখান থেকে মক্কার পাহাড়গুলো দেখা যেতো। মক্কা থেকেও মাররুয যাহরানের স্হাপিত শিবিরগুলো স্পষ্ট বোঝা যেতো। রাসূলুল্লাহ (সা.) নির্দেশে প্রত্যেক তাঁবুতে ভিন্ন ভিন্ন আলোর ব্যবস্হা করা হয়েছে। যার ফলে সমস্ত মরুভূমি একটি আলোকিত ভূমিতে পরিণত হলো। সারা আরব অঞ্চল আলোয় ঝলমল হয়ে উঠলো।

আবু সুফিয়ানের ইসলাম গ্রহণ: এদিকে কুরাইশদের বাড়ি বাড়ি খবর পৌঁছে গেল, মুহম্মদ তাঁর বাহিনী নিয়ে মক্কা উপকণ্ঠে এসে গেছে। খবর অনুসন্ধানের জন্য তারা আবু সুফিয়ান হাকিম ইবনে হিযাম বুদাইল ইবনে ওয়ারাকাকে পাঠাল। রাসূলুল্লাহ (সা.) এর তাঁবু পাহারায় যারা ছিল তারা আবু সুফিয়ানের বাহিনীকে দেখে ফেলল।

হজরত ওমর ফারুক (রা.) প্রতিশোধ প্রবণ হয়ে রাসূল (সা.) কাছে অনুমতি চাইলেন, আব্বাস (রা.) তার জীবন বাঁচানোর কথা বলছেন। হজরত ওমর ফারুক (রা.) আবার অনুমতি চাইলেন। আবু সুফিয়ানকে পাকড়াও করে সাহাবীরা নবীর তাঁবুতে নিয়ে এলেন।

হজরত ওমর ফারুক (রা.)-কে কোনো ভাবেই থামানো যাচ্ছে না। আবু সুফিয়ান ভয়ে কম্পমান। ছাতি শুকিয়ে চৌচির। আজ হয়তো আর রক্ষা নেই। মরতেই হবে। তাহলে কি আমি আর যুদ্ধ করতে পারবো না? এখানেই আমাকে শেষ করে দেওয়া হবে? দুশ্চিন্তার রাজ্যে আবু সুফিয়ান।

আবু সুফিয়ানও জানে নবীর বিরুদ্ধে, ইসলামের বিরুদ্ধে, আরবের অন্যান্য গোত্রকে নবীর বিরুদ্ধে উসকে দেওয়া ও মদীনা আক্রমণসহ আরো কতো কিছু করেছে। নবী মুহাম্মাদ (সা.) ও ইসলামের বিরুদ্ধে আজকে সেই সবের প্রতিশোধ তারা নিবে। এখানেই আমি শেষ!

এই সব ভাবনায় যখন আবু সুফিয়ান কাতর; তখন দয়ার আধার ও ক্ষমাশীলতার মূর্তপ্রতীক রাসূলুল্লাহ (সা.) আবু সুফিয়ানের কানে কানে বললেন, আজকে ভয়ের দিন নয়। তাবারির বর্ণনায় এসেছে, হুজুর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আর আবু সুফিয়ান কিছুক্ষণ আলাপ করেন। তাদের সেই আলাপ নিচে দেওয়া হলো, : হে সুফিয়ান এখনো কি বিশ্বাস হয়নি আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই?

: আজ যদি কোনো উপাস্য থাকতো, তাহলে আজকে আমার এই অবস্হা হতো না। নমনীয়তার সুর আবু সুফিয়ানের গলায়। হাসি আনন্দ অনেকের চোখে-মুখে। তার কথায় ইসলাম গ্রহণের স্বীকৃতি। হয়তো সে এখনই ইসলাম গ্রহণ করবে। : এতে কি তোমার কোনো সন্দেহ আছে যে ‘আমি আল্লাহর রাসূল’? : সামান্য আছে বইকি,

এর পর আবু সুফিয়ান ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করলেন। এটা প্রকৃত ইসলাম গ্রহণ ছিল কিনা, তার পরবর্তী জীবনী থেকে জানা যায়। তার ইসলাম গ্রহণটা ছিল খাঁটি ইসলাম গ্রহণ। ইসলামের পক্ষে তায়েফের যুদ্ধে মারাত্মকভাবে তার একটি চোখ যখম হয়, ইয়ারমুকের যুদ্ধে তার দৃষ্টি হারিয়ে যায়।

মক্কা বিজয়: ইসলাম গ্রহণের পর রাসূলুল্লাহ (সা.) হজরত আব্বাস (রা.)-কে আদেশ দিলেন; আবু সুফিয়ানকে পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড় করিয়ে দাও, যেন সে ইসলামের শক্তিমত্তা ও জৌলুশ দেখতে পায়।

মক্কার ভেতর দিকে একে একে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর বাহিনী প্রবেশ করছে। মুহুর্মুহ আল্লাহু আকবার স্লোগানে মুজাহিদ বাহিনী এগিয়ে চলছে। উত্তাল সমুদ্রে বাধাহীন তরাঙ্গের মতো একেক গোত্র আসছে আর যাচ্ছে। প্রথমে গিফারগোত্র, অতপর জুহাইনিয়াহ, হুযাইম সুলাইম। সর্বাধুনিক অস্ত্রে-শস্ত্রে সজ্জিত অপ্রতিরুদ্ধ এক বাহিনী।

বাহিনীর আধিক্যতা ও বিশালতা আবু সুফিয়ানের ভেতরে ঝড় তুলে দিলো। রণসাজে সজ্জিত আনসারদের একটি গোত্র আবু সুফিয়ানের চোখে পড়লো। তাদের সেনাপতি ছিল সাআদ ইবনে উবাদাহ।

সে আবু সুফিয়ানকে অতিক্রম করার সময় বললো, ‘আজ তুমুল যুদ্ধের দিন। আজ কাবাকে হালাল করার দিন’ আবু সুফিয়ান ভড়কে গেলেন। চিৎকার করে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বললেন- আবু উবাদাহ কি বলে! উত্তরে রাসূল (সা.) বললেন, আবু উবাদাহ ভুল বলছে।

মক্কায় পৌঁছে রাসূল (সা.) নবুওয়াতির পতাকা হাজুন নামক স্হানে স্হাপন করতে নির্দেশ দিলেন। সৈন্যগণকে উঁচুতে আসার নির্দেশ দিলেন।

ঘোষণা করে দেওয়া হলো, যে ব্যক্তি আত্মসমর্থন করবে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে, যে আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে আর যে নিজ ঘরের দরজা বন্ধ করে বসে থাকবে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে। ওইদিন হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিপুল শক্তিসাহস ও সৈন্যবাহিনী থাকা সত্ত্বেও কোনো রক্তপাতের ঘটনা ঘটাননি।

যদি চাইতেন মক্কার কোনো ব্যক্তি ঘরবাড়ি প্রতিষ্ঠান অবশিষ্ট থাকতো না। সবকিছু মাটির সঙ্গে ধূলিস্যাত করে দিতে পারতেন। তিনি করেননি, কারণ তিনি রক্তপান বন্ধের জন্য পৃথিবীতে এসেছেন। কোনো যুদ্ধ বিগ্রহ সমর বা হাঙ্গামার জন্য আসেননি। ঐতিহাসিকরা লিখেন, যদি মক্কা বিজয়ের দিন রক্তপাত ঘটাতেন তাহলে বুঝা যেত এই নবী মানবতার নবী নন।

কাবা চত্বরে দয়ার নবী: এই সেই চত্বর যেখানে নবিজী (সা.) নামাজ পড়েছিলো, আর তার পিঠে অত্যাচারীরা রেখেছিল উটের পচা নাড়ি ভূরি। কতোই নিষ্ঠুর নির্দয় আচরণ ছিল। কোথায় আজকে সেই দাপুটেরা। কোথায় মক্কার অধিপতিরা! এই কাবাচত্বরে মুহম্মদ (সা.) অবাঞ্চিত ঘোষণা কারীরা আজ কোথায়?

মিথ্যার দাপট আজ নিস্তব্ধ হয়ে গেছে, অন্ধ অহমিকার শক্তি আজ নিষ্প্রভ হয়ে গেছে। কাবার চাবি নিয়ে কাবাতে প্রবেশ করলেন, ‘সত্য এসে গেছে মিথ্যা নির্মূল হয়েছে, নিঃসন্দেহ মিথ্যা নির্মূল হবারই বিষয়’ আয়াত পড়ে পড়ে মহাত্মা ইব্রাহিম (আ.) এর আমলের পবিত্র কাবার পরিবেশ গড়ে তুলেন।

কাবার ভেতরে থাকা জাহিলি যুগের ৩৬০টি মূর্তি মূর্তি ভেঙ্গে দিলেন। হজরত ওমর ফারুক (রা.) দেয়ালে আঁকা নানান দেবদেবির মূর্তি ও প্রতীকীরুপ তুলে দিলেন। প্রায় পাঁচশ বছর যাবত নির্যাতিত কাবা আজ পবিত্র হলো, তাওহিদের বাণীতে আন্দোলিত হলো কাবার পরিবেশ।

বিজয়ী ভাষণ: ‘মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবশেষে একটি ভাষণ প্রদান করেন। যে ভাষণটি রাসূল (সা.) সমস্ত অন্ধবিশ্বাস ও ভিন্ন ভিন্ন উপাসনার অসাড়তা ও তাওহিদের মর্মবাণী ফোঁটে ওঠেছে। আজকের দিনেও ওই ভাষণটি প্রাণবন্ত । হামদ ও সালাতের পর, ‘এক আল্লাহ ভিন্ন আর কোনো উপাস্য নেই।

তিনি তার ওয়াদা সত্যে পরিণত করেছেন এবং সম্মিলিত বাহিনীকে একাই পরাভূত করেছেন। জেনে রাখ, আজ থেকে জাহেলিয়াতের সমস্ত গর্ব অহঙ্কার পূর্বের সমস্ত রক্তের প্রতিশোধ এবং সমস্ত রক্তপণের দাবি আমার এ পদতলে প্রোথিত। তবে কাবাগৃহের তত্ত্বাবধান ও হাজীদের পানি পান করানোর বিষয়টি স্বতন্ত্র।’

হে কুরাইশগণ! এখন আল্লাহ তায়ালা জাহেলিয়াতের গর্বাহঙ্কার ও বংশ গৌরব মিটিয়ে দিয়েছেন। কারণ, সমগ্র মানুষ আদমের বংশ। আর আদমের সৃষ্টি মাটি থেকে। হে মানবসকল! আমি তোমাদেরকে এক নারী ও এক পুরুষ থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বংশ ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনে নিতে পার।

নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সম্মানিত ব্যক্তি সে-ই যে তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা খোদাভীরু। অবশ্যই আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও যাবতীয় বিষয়ে পূর্ণ ওয়াকিফহাল। অবশ্যই আল্লাহ ও তার রাসূল মদ ক্রয় বিক্রয় হারাম করে দিয়েছেন।’ এই ছিল ওইদিনের ভাষণের মূল বক্তব্য।

ভাষণ থেকে শিক্ষা: আরবদের চিরাচরিত স্বভাব রক্তপণ বাতিল করা হয়েছে। মালিক দাসের আচরণে সমতা আনা হয়েছে। সাদা-কালোর বিভাজন পর্দা ছিড়ে ফেলা হয়েছে, বংশ গৌরবের ঔদ্ধৃত চিরতরে মিটিয়ে দেওয়া হয়েছে।

রাসূল (সা.) এর রক্তপাতহীন মক্কাবিজয় ও ভাষণ যখন মরুভূমিতে বিদ্যুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। তখন দলে দলে ইসলামের ছায়া মানুষ পঙ্গপালের মতো আসছিল।

প্রতিদিন আরবের নানান প্রান্ত থেকে গোত্রপতিরা আসতেন আর ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নিতেন। যেন পিপার্স মানুষ বহুদিন পর পেয়েছে সুপীয় পানির ঝরনাধারা। মক্কা বিজয়ের মধ্য দিয়ে পৃথিবীতে ইসলাম সুপীয় ধারা প্রবাহিত হতে থাকে। অনাদিকাল পর্যন্ত চলতে থাকবে এই ধারা। ইনশাল্লাহ।