২৬, সেপ্টেম্বর, ২০১৮, বুধবার

শেষ হল যুদ্ধ ! গুহা থেকে উদ্ধারের পর থাইল্যান্ডজুড়ে প্রশংসায় ভাসছে দেশহীন আদুল

আপডেট: জুলাই ১১, ২০১৮

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন
শেষ হল যুদ্ধ ! গুহা থেকে উদ্ধারের পর থাইল্যান্ডজুড়ে প্রশংসায় ভাসছে দেশহীন আদুল

চৌদ্দ বছর বয়সী আদুল সাম-অনের কাছে এমন ভয়াবহ বিপদ নতুন কিছু নয়; মাত্র ছয় বছর বয়সে গেরিলা যুদ্ধের মধ্যে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসতে হয়েছে তাকে।

পড়াশোনা ও উন্নত জীবনের সুযোগ পাবে এমন আশায় তার বাবা-মা তাকে থাইল্যান্ডেই রেখে আসেন। সংঘাতপূর্ণ মিয়ানমারে তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাননি।

কিন্তু মৃত্যু থেকে তার সবচেয়ে বড় পলায়নটি ঘটেছে মঙ্গলবারে। এদিন থাম লুয়াং গুহায় অন্য ১১ কিশোর ফুটবল খেলোয়াড় ও তাদের কোচসহ সে দুই সপ্তাহ আটকা থাকার পর মুক্তি পেয়েছে।

ওয়া নৃতাত্ত্বিক উপজাতির এই সদস্য গুহার ভেতরে মৃত্যুর মুখ থেকেও সবাইকে বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সে ব্রিটিশ ডুবুরিদের দোভাষী হিসেবে কাজ করেছে। নিজেদের অবস্থা ও প্রয়োজনীয় তথ্যবিনিময় করেছে সে।

আদুল ইংরেজি, থাই, বার্মিজ ও মান্দারিনসহ বেশ কয়েকটি ভাষায় কথা বলতে পারে। জলমগ্ন গুহার ভেতরে আটকা থাকার সময় সে ব্রিটিশ ডুবুরিদের জানিয়েছে, তারা কতদিন আটকা ছিল, খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনের কথা।

যখন তার সহযোগী খেলোয়াড়রা ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে খাবার চাচ্ছিল, তখন সে চমৎকারভাবে নিজেদের প্রয়োজনের কথা ডুবুরিদের জানিয়েছে। এতে তারা অনেক সমস্যাই সহজে এড়িয়ে যেতে পেরেছে।

ব্রিটিশ ডুবুরিদের প্রকাশ করা ছবিতে তার শুকনা মুখের দেঁতো হাসি সবার নজর কেড়েছে। থাইল্যান্ডের মেই সেই শহরের সীমান্তে একটি গির্জায় থাকে আদুল। কাজেই মুক্তির পর তাকে নিয়ে সেখানে সবাই উৎসবে মেতে উঠেছিল।

সহিংসতাপ্রবণ মিয়ানমারে রাষ্ট্রহীনভাবে জন্ম নিয়েছে আদুল সাম। থাই খ্রিস্টান শিক্ষকদের কাছে বেড়ে উঠেছে সে।

সে নির্ভীক ও বিনয়ী। অল্পতেই সবার হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পারে।

বড় বড় চোখের এই কিশোরটি এবার সারা দুনিয়াতে আলো ছড়িয়েছে। থাই গুহায় তাদের খুঁজে পাওয়ার পর হাড় জিরজিরে ১৪ বছর বয়সী এই কিশোর চোস্ত ইংরেজিতে জানায়, আমি আদুল। আমার শরীর ভালো আছে। আমি সুস্থ।

তার প্রশিক্ষক ফেন তাইয়াপরম বলেন, তার সঙ্গে কথা বলার পর প্রথমে যেটা আমার মনে এসেছে, তা হল- তার আচরণ খুবই চমৎকার। স্কুলে আসার পর যে শিক্ষকের সঙ্গে তার দেখা হতো না কেন, সবাইকে শুভেচ্ছা জানাত।

২ জুলাই গুহায় তাদের খোঁজ পাওয়া গেছে। কিন্তু ১২ কিশোর ও এক কোচের মধ্যে একমাত্র সে-ই ব্রিটিশ ডুবুরিদের সঙ্গে ইংরেজিতে যোগাযোগ করতে পেরেছে।

গুহার ভেতর থেকে ভিডিওতে তাকে চিৎকার করে বলতে দেখা গেছে, আজ কি বার? ডুবুরিদের সে জানিয়েছে, তারা সবাই ক্ষুধার্ত।

মিয়ানমারের স্বশাসিত ওয়া স্টেইটে জন্ম নেয়া আদুল সাত বছর বয়স থেকেই স্কুলে যাচ্ছে। কখনও কখনও বাবা-মা এসে খ্রিস্টান গির্জায় গিয়ে তাকে দেখে আসে।

স্বশাসিত ওয়া রাজ্যকে আন্তর্জাতিকভাবে কিংবা মিয়ানমারও স্বীকৃতি দেয়নি। তারা বৈধভাবে পাসপোর্টও ধারণ করতে পারে না।

নৃতাত্ত্বিক বিদ্রোহী গোষ্ঠী সংযুক্ত ওয়া স্টেট আর্মি ও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কারণে হাজার হাজার অধিবাসী নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। তাদের অনেকেই পার্শ্ববর্তী থাইল্যান্ডে আশ্রয় নিয়েছেন।

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশন (ইউএনএইচসিআর) জানিয়েছে, থাইল্যান্ডে চার লাখেরও বেশি মানুষ রাষ্ট্রহীন বলে নিবন্ধিত, আদুল তাদেরই একজন।

ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র হান্নাহ ম্যাকডোনাল্ড বলেন, কিছুটা উন্নতি হলেও থাইল্যান্ডের রাষ্ট্রহীন এসব মানুষকে মৌলিক চাহিদা পূরণে লড়াই করে যেতে হয়েছে।

এসব মানুষের কোনো জন্ম সনদ, পরিচয়পত্র কিংবা পাসপোর্টও নেই।

দেশটিতে তারা বৈধভাবে বিয়ে করতে পারবে না। এমনকি তারা কোনো চাকরিও পাবে না। ব্যাংক হিসাব খুলতে পারবে না, কোথাও ভ্রমণ করতে পারবে না। তারা কোনো সম্পত্তির মালিক কিংবা ভোট দিতেই পারবে না।

২০১৪ সাল নাগাদ সব রাষ্ট্রহীন লোককে নিবন্ধিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে থাইল্যান্ড। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের আগে এসব মানুষকে নানা আইনি জটিলতায় থাকতে হবে।

ফুটবলের প্রতি আদুলের মারাত্মক অনুরাগ। সে যেমনি একজন ভালো ছাত্র, তেমনি গিটার, পিয়ানো বাজাতেও ভালোবাসে।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন